About

ইংরাজী ১৯২৩ সাল। মাঁঘী পূর্ণিমার পুণ্য উৎসবান্তে বাজিতপুরের মাটিতেই একদল ত্যাগব্রতি সন্ন্যাসীর সহিত পল্লীর বিশিষ্ট জনসাধারণ এক স্মরণীয় সভায় সম্মিলিত । যুগাচার্‍য্য স্বামী প্রণবানন্দ তৎকালে ব্রহ্মচারী বিনোদ—স্বয়ং উপস্থিত । সকলের ইচ্ছা ও আলোচনাক্রমে পরিকল্পিত সেবা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয় ‘ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ’।

তিনি বললেন, “ আমার সঙ্ঘ হবে দ্বিতীয় বুদ্ধের সঙ্ঘ, আমি সমগ্র দেশ ও জাতিকে বুদ্ধ, শঙ্কর, চৈতন্যের মত নূতন আদর্শ ও তপঃশক্তিতে সঞ্জীবিত করতে চাই ।”

এই জনকল্যান প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ জন্মগ্রহণ করেন ইং ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে ২৯ জানুয়ারী বাং ১৩০২, ১৬ই মাঘ বুধবার গোধুলি লগ্নে, মাঁঘী পূর্ণিমার পূণ্যতিথিতে ফরিদপূর জেলার বাতিসপূর গ্রামে, অধূনা বাংলাদেশ । পিতার নাম বিষ্ণুচরণ, মাতা সারাদাদেবী । বুধবারে জন্ম বলে শিশুর ডাক নাম ‘বুধাই’ শিশুর জন্মলগ্ন হতে পারিবারিক শান্তি ফিরে আসে সর্বত্র জয়ের লক্ষণ দেখা যায় তাই তার আর এক নাম ‘জয়নাথ’ অন্নপ্রাশন কালে নামকরন ‘বিনোদ’ । কৈশরকাল থেকেই তিনি ‘সাধু’ বলে পরিচিত ছিলেন । তাঁর সংযমময় আচার আচরণের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই জনসাধারণ তাঁকে ‘সাধু’ বলে অভিহিত করতো । আজ বাজিতপুর প্রণবমঠের নিকটবর্তী সরকারী রাস্তার একটি বিশেষ সেতু ‘সাধুর ব্রিজ’ নামে সুপরিচিত । পাকিস্তান আমলে তৈরী এই সেতুটির নামকরণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধাক্রমেই প্রচলিত হয়েছে । বাল্যবিধি স্বভাবে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র । ধীর, স্থির, গম্ভীর, স্বল্পভাষী, স্বল্পনিদ্র, স্বল্পহারী, আত্মস্থ, ভাবস্থ, অনাসক্ত, নির্লিপ্ত । স্বভাবযোগীর সমদয় লক্ষণ তাঁহার শরীরে, আচরণে, মননে, ধ্যানে । কঠোর সংযমী ও ব্রহ্মচর্য-নিষ্ঠ । শরীরে অযুত হস্তীর বল । মনে অমিত তেজঃ আর আত্মপ্রত্যয় । অধ্যয়ন জীবনেই তিনি যোগনিষ্ঠ । অধিকাংশ সময়েই ধ্যান ধারণা, বৈরাগ্যচিন্তা ও আত্মচিন্তায় ডুবে থাকতেন । বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত হত যোগ সাধনায়-গ্রামের নির্জন শ্মশানে । কিন্তু কেবল ব্যক্তিগত মুক্তির জন্য তিনি সাধনা করেননি । বিপদে আপদে মানুষের সেবায় সর্বদা উপস্থিত হতেন । ছাত্রজীবনেই তাঁকে কেন্দ্র করে বালক, কিশোর ও তরুণদের এক বিশেষ গোষ্ঠী গড়িয়া উঠে তাঁর উপদেশ ও সাধননীতির আদর্শে । তিনি বলতেন-“যে শুধু নিজের সুখ-সুবিধা, আরাম-বিরাম নিয়া থাকে সে কি মানুষ । দেশের দুঃখ-দুর্দ্দশায় যাহার প্রাণ কাঁদে না, জাতি ও সমাজের বিপদাপদে যে ব্যথা অনুভব করে না সে তো নিতান্ত জড় পদার্থ, গাছ পাথরের সঙ্গে তাহার পার্থক্য কি ? এরূপ লোক শতসহস্র থাকিলেই বা জাতির কি আসে যায় ? মানুষ যেঃতাহার হৃদয়ে অপরের প্রতি সহানুভূতি থাকা চাই । দেশ সেবা সমাজের কল্যান-সব কিছুর মূলে এই হৃদয় বক্তা পরদুঃখানুভূতি ।” আত্মজীবন গঠন সম্বন্ধে বলতেন,-“ত্যাগই জীবনের মূল মন্ত্র, সংযমই কঠোর তপস্যা । ত্যাগ, সংযম, সত্য সাধক-জীবনের মূল স্তম্ভ ।” তিনি ইং ১৯১৩ সালে দীক্ষা নিলেন-যোগিরাজ বাবা গম্ভীরনাথজীর সমীপে । ১৯৪৬ সালে মাঘী পূর্ণিমার তিথিতে তাঁর যোগসিদ্ধি । পূর্ণ ভাগবতী মহাশক্তির আবির্ভাব ঘটল তাঁর তপপূতঃ দেব শরীরে । সমাধীভঙ্গের পরই তাঁর শ্রীকণ্ঠে উদাত্ত ঘোষণা “ এ যুগ মহাজাগরণের যুগ , এ যুগ মহামিলনের যুগ, এ যুগ মহামুক্তির যুগ । ” ১৯২৪ সালে প্রয়াগে অর্দ্ধকুম্ভমেলায় স্বামী গোবিন্দানন্দ গিরিজীর নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ পূর্ব্বক তিনি ‘স্বামী প্রণবানন্দ’ নামে পরিচিত হলেন । এরপর আরম্ভ হলো ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মাধ্যমে লোকমঙ্গল মহাযঞ্জ । তিনি স্বয়ং পরিচিত হলেন ‘সঙ্ঘনেতা’ রূপে । সঙ্ঘের মূল উদ্দেশ্য-ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রগঠন । সঙ্ঘ ও সঙ্ঘনেতার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যের ধারক ও বাহকরূপে গঠিত হলো একদল সংসারবিরাগী আধ্যাত্ম সৈনিক-যাঁদের লক্ষ্য হলো আত্মমুক্তি ও বিশ্বকল্যান । এঁরা পরিচিত হন সঙ্ঘ সন্তানরূপে । স্বামী প্রণবানন্দের প্রতিষ্ঠিত ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ অত্যল্প কালের ভিতরে প্রভূত লোকপ্রিয়তা অর্জন করেন । তাঁর উদ্দেশ্যের নানা বিভাগের কর্মসাফল্যে তাঁর ভাগবত ব্যক্তিত্বের বিশ্বরূপটি আমাদের সম্মুখে উদ্‌ঘাটিত করে । তিনি তদীয় তপঃশক্তি “বহুজনহিতায় বহুজনসুখায় ” নিয়োগ করেন । ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের ৮ই জানুয়ারী : বাংলা ২৪শে পৌষ ১৩৪৭ সাল বুধবার রাত্রি ১২-৪৫ মিনিটে কোলকাতায় প্রধান কার্যালয়ে তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন । ~~~~~~~~~~~ সঙ্ঘের প্রকাশিত ‘আচার্য্য স্বামী প্রণবানন্দ ও শ্রীশ্রীপ্রণবমঠ ’ হতে উদ্ধৃত । ~~~~~~~~~~~